Sunday, 13 September 2026, am 00:37
Sunday, 13 September 2026, am 00:37

সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও পঞ্চায়েতের নিষ্ক্রিয়তা: ব্যাহত হচ্ছে গ্রাম্য সালিশ

শেয়ার করুন

এম. সাইফুর রহমানঃ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। যে সমাজের বাইরে চলে যায়, সে হয়তো পশু, নয়তো দেবতা—মানুষ নয়। আদিমকাল থেকেই মানুষ একাকিত্বকে পছন্দ করেনি। গুহায় বসবাসের সময়ও মানুষ সংঘবদ্ধভাবে পশুপাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। কালের বিবর্তনে সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ গড়ে তুলেছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, দালানকোঠা এবং সম্পদের মালিকানা। পারিবারিক সুখ-দুঃখে অংশীদারিত্ব, বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই ছিল মানুষের সামাজিক বন্ধনের দৃঢ় ভিত্তি।

কিন্তু বর্তমান সময়ে গাড়ি-বাড়ি, দালানকোঠা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতায় সেই ঐতিহ্যবাহী সামাজিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। হানাহানি, কাটাকাটি, সংঘাত, খুন, গুম ও প্রতারণার মতো ঘটনা সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ—গ্রাম্য সালিশ ও মুরব্বিদের নেতৃত্বে সামাজিক বিচারব্যবস্থা। একই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষে মানুষে সেই অকৃত্রিম বন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির সংস্কৃতি। দিন দিন মানুষ যেন আরও কঠিন ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে; কমে যাচ্ছে স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।

একটা সময় ছিল, মানুষে মানুষে কিংবা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে কোনো বিরোধ দেখা দিলে প্রতিকারের জন্য থানা-কোর্ট-কাচারিতে যাওয়ার আগে গ্রামের মুরব্বি, মোড়ল, সর্দার ও পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হওয়া ছিল স্বাভাবিক রীতি। এলাকার কোনো মানুষের বিপদে পঞ্চায়েতের সদস্য ও মুরব্বিরা ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সামাজিক সমস্যার সমাধান করা যেন তাঁদের দায়িত্বের পাশাপাশি নৈতিক কর্তব্যও ছিল।

পঞ্চায়েতের সর্দার ও মুরব্বিদের প্রতি সমাজের মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ছিল অপরিসীম। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিবাদে বিচার করা তাঁদের কাছে ছিল স্বাভাবিক সামাজিক দায়িত্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ, ঘুষ কিংবা প্ররোচনার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন। বিয়ে-সাদি, সুন্নতে খতনা, আকিকা, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ নানা আচার-অনুষ্ঠানে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতিটি কাজকে তাঁরা নিজেদের কাজ মনে করতেন এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতেন।

গ্রামীণ সমাজে কোনো পরিবার বা ব্যক্তি সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে পঞ্চায়েত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডেকে কারণ জানতে চাওয়া হতো এবং ভুল স্বীকার করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতো। সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে অনেক সময় সামাজিকভাবে সতর্ক বা বর্জনও করা হতো। যদিও এসব ব্যবস্থার সবকিছু বর্তমান আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়, তবু এর মাধ্যমে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক জবাবদিহির একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে উঠেছিল—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

গ্রামের কোনো মানুষ মারা গেলে কবর খনন থেকে শুরু করে দাফন-কাফনের যাবতীয় কাজে গ্রামের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে আসত। মসজিদ-মক্তবের দায়িত্ব পালনে মুরব্বিরা ছিলেন আন্তরিক ও আপসহীন। কীভাবে মক্তব পরিচালিত হবে, কীভাবে শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়—এসব বিষয়েও তাঁরা নিবিড়ভাবে নজর রাখতেন।

গ্রামে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সালিশে বসা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কোনো বিরোধ নিয়ে বিচার বসলে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করার চেষ্টা করা হতো। ফলে ছোটখাটো পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিয়ে প্রতিনিয়ত থানায় কিংবা আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—গুরুতর অপরাধ, যেমন হত্যাকাণ্ড বা মারাত্মক জখমের মতো অপরাধের বিচার করার আইনগত ক্ষমতা পঞ্চায়েতের ছিল না এবং এখনও নেই। এসব অপরাধ রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। গ্রাম্য সালিশের মূল ভূমিকা হওয়া উচিত ছোটখাটো সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আইনগত সীমার মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা।

একসময় কোনো ছেলে-মেয়ে বাবা-মায়ের অসম্মতিতে পালিয়ে বিয়ে করলে কিংবা কোনো পরিবার গুরুতরভাবে সামাজিক রীতি লঙ্ঘন করলে পঞ্চায়েত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করত। সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হতো। মুরব্বি, সর্দার ও সালিশকারীদের প্রতি এমন শ্রদ্ধাবোধ ছিল যে, তাঁদের সামনে দাঁড়ানো বা তাঁদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করাকে মানুষ অত্যন্ত গুরুতর বিষয় মনে করত।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্রাম্য সালিশ ও সামাজিক বিচারব্যবস্থা অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমেই মামলামোকদ্দমার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পারস্পরিক বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সামাজিক বিভাজনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। সমাজে অশান্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের নানা চিত্রও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কোথাও কোথাও সালিশের নামে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে অর্থ, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে প্রকৃত ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একসময়ের নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মুরব্বিদের জায়গায় যখন ব্যক্তিস্বার্থপ্রবণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন মানুষের আস্থা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

আগের দিনের মতো সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে মুরব্বিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। উঠানে উঠানে সালিশ বসার দৃশ্যও ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গায় দূরত্ব বাড়ছে। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে এবং পঞ্চায়েতের কার্যকর ভূমিকা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রতি নতুন করে নজর দিতে হবে। তবে অতীতের সব রীতিনীতি অন্ধভাবে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং যেসব ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহযোগিতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা সৃষ্টি করত, সেগুলোকে আধুনিক আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

পঞ্চায়েতকে হতে হবে নিরপেক্ষ, ন্যায়নিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক। সালিশকারীদের ঘুষ, প্রভাব, পক্ষপাত ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সালিশের নামে কোনো ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘন, অবৈধ শাস্তি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের আশ্রয় নিতে হবে।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে। বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের কর্মশক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

হারিয়ে যাওয়া মুরব্বিদের স্মরণ করে তাঁদের ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পঞ্চায়েতের প্রতি আবারও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে হতে হবে আপসহীন এবং ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাবমুক্ত। তাহলেই আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধনের সংস্কৃতি নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।

আমরা যদি অতীতের ভালো ঐতিহ্যকে ধারণ করে বর্তমানের আইন ও মানবাধিকারের মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও সুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। সমাজের প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্যমকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য তৈরি করা সম্ভব একটি নিরাপদ, মানবিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ ভবিষ্যৎ।

লেখক: এম. সাইফুর রহমান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট, মৌলভীবাজার।

সাম্প্রতিক

আরো পড়ুন