রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অ্যাডভোকেট শিশির মনির আইকনিক ব্যক্তিত্ব
ব্যক্তিকে ব্যক্তি হিসেবে দেখার জায়গা
কোনো মানুষকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আমি সবসময় তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, মেধা, আচরণ ও পেশাগত দক্ষতাকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় থেকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করি। সেই জায়গা থেকেই বলছি—আমি ব্যক্তি অ্যাডভোকেট শিশির মনিরকে পছন্দ করি, রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে নয়। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিসর নিয়ে আমার একাধিক প্রশ্ন, আপত্তি ও দ্বিমত রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেই একজন মানুষের ব্যক্তিগত মেধা, অধ্যবসায় ও পেশাগত দক্ষতাকে অস্বীকার করতে হবে—এমনটা আমি মনে করি না। বরং একজন মানুষের ভালো দিককে স্বীকার করার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করাই একটি পরিণত ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
একজন আইনজীবী হিসেবে শিশির মনির
অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় আমার কাছে তাঁর আইনজীবী পরিচয়। আদালতে যুক্তি উপস্থাপন, আইনের বিষয়কে বিশ্লেষণ করা, জটিল বিষয়কে কাঠামোবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করা এবং নিজের বক্তব্যকে প্রাসঙ্গিক আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা চোখে পড়ার মতো। একজন ভালো আইনজীবীর অন্যতম শক্তি হলো—তিনি শুধু আইন জানবেন না, বরং আইনের ভাষাকে যুক্তির ভাষায় রূপান্তর করতে পারবেন। শিশির মনিরের মধ্যে সেই সক্ষমতার প্রকাশ আমি দেখতে পাই। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, আবার কেউ দ্বিমতও করতে পারেন; কিন্তু তাঁর উপস্থাপনার দক্ষতা অস্বীকার করা কঠিন।
বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও বিশ্লেষণী শক্তি
শিশির মনিরের প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার অন্যতম কারণ তাঁর ইনটেলিজেন্স বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা। তিনি কোনো বিষয়কে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তির কাঠামোর মধ্যেও উপস্থাপন করতে পারেন। একটি মামলার আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক বিষয়, বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা রাষ্ট্র ও আইনের সম্পর্ক—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বিশ্লেষণী চিন্তার ছাপ থাকে। একজন বক্তার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সুন্দর কথা বলা নয়; বরং শ্রোতাকে ভাবতে বাধ্য করা। এই জায়গায় শিশির মনিরের বক্তব্য অনেক সময় আলাদা মাত্রা তৈরি করে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন এক বিষয় নয়
আমাদের সমাজে একটি সমস্যা হলো—কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর প্রতিটি কাজকে দলীয় চশমা দিয়ে দেখা হয়। ফলে একজন মানুষের ভালো কাজের প্রশংসা করলেই অনেকে ধরে নেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকেও সমর্থন করা হচ্ছে। আমি এই ধারণার সঙ্গে একমত নই। একজন মানুষ রাজনৈতিকভাবে যে অবস্থানেই থাকুন না কেন, তাঁর কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা বা গুণের প্রশংসা করা মানেই তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমর্থন করা নয়। শিশির মনিরের ক্ষেত্রেও আমার অবস্থান স্পষ্ট: তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পছন্দকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
একাত্তর নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্কের জায়গা
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মৌলিক অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কোনো আলোচনা হলে সেখানে আবেগের পাশাপাশি ইতিহাস, নথি, প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। শিশির মনিরকে ঘিরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দায়-দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেটিকে আমি হালকাভাবে দেখার সুযোগ দেখি না। তবে একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও প্রামাণ্য ইতিহাসের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন। ইতিহাসের বিচার আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে হওয়া উচিত।
বিতর্ক থাকা মানেই সব গুণ অস্বীকার করা নয়
কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, তাঁর মতাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, এমনকি তাঁর কিছু অবস্থানের তীব্র সমালোচনাও করা যেতে পারে। কিন্তু এসব কারণে তাঁর সব ব্যক্তিগত যোগ্যতা অস্বীকার করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একজন মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করা এবং তাঁর পেশাগত দক্ষতার প্রশংসা করা—দুটি বিষয় একই সঙ্গে সম্ভব। বরং এই পার্থক্যটি বুঝতে পারাটাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয়। আমি শিশির মনিরকে ঠিক সেই জায়গা থেকেই দেখি।
‘আইকনিক’ ব্যক্তিত্ব বলার কারণ
আমি তাঁকে ‘আইকনিক’ বলি মূলত তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃশ্যমানতা, উপস্থাপনা, পেশাগত পরিচিতি এবং নিজস্ব বক্তব্যের ধরন বিবেচনা করে। আইনজীবীদের মধ্যে কেউ কেউ শুধু আদালতের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেন; আবার কেউ তাঁদের বক্তব্য ও কাজের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন। শিশির মনির দ্বিতীয় শ্রেণির একজন দৃশ্যমান আইনজীবী হিসেবে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর কথা বলার ধরন, যুক্তি সাজানোর পদ্ধতি এবং জনপরিসরে আইনি বিষয় ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা তাঁকে অনেকের কাছেই আলাদা করে তুলেছে।
মেধার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত
আমার বিশ্বাস, একজন মানুষের মেধাকে সম্মান করার জন্য তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হওয়া জরুরি নয়। বরং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজে মতের বৈচিত্র্য থাকবে এবং ভিন্নমতের মানুষের মধ্যেও যোগ্যতা ও মেধাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সংস্কৃতি থাকবে। আমি যদি কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক বক্তব্যের বিরোধিতা করি, কিন্তু তাঁর আইনি দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করে, তাহলে সেই দক্ষতার প্রশংসা করতে আমার কোনো সংকোচ থাকা উচিত নয়। কারণ সত্যিকার অর্থে মেধা কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়।
সমালোচনার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ
শিশির মনিরের পেশাগত দক্ষতার প্রশংসা করার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও আমার আছে। কোনো ব্যক্তিকে পছন্দ করা মানে তাঁর সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। আবার কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করাও তাঁর সব কাজকে খারাপ বলে দেওয়ার লাইসেন্স নয়। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য আমাদের এই ভারসাম্য প্রয়োজন। ব্যক্তিকে সম্মান করা এবং তাঁর মতাদর্শের সমালোচনা করা—দুটিই একই সঙ্গে করা সম্ভব।
আইনজীবীদের কাছ থেকে যে বিষয়টি শেখার আছে
একজন আইনজীবীর কাজের অন্যতম সৌন্দর্য হলো—একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। নিজের বিশ্বাসের বিপরীত অবস্থানও যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হয়। এই পেশাগত অনুশীলন একজন আইনজীবীর চিন্তাশক্তিকে গভীর করে। শিশির মনিরের পেশাগত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে তাঁর মধ্যে এই ধরনের যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনার প্রবণতা দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তাঁর যুক্তি কীভাবে সাজানো হয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করা একজন আইনপেশার মানুষের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
ব্যক্তিপূজা নয়, গুণের স্বীকৃতি
আমি শিশির মনিরের ব্যক্তিপূজা করি না এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমর্থকও নই। আমি তাঁর মধ্যে যে গুণগুলো দেখি, সেগুলোর স্বীকৃতি দিতে চাই। একজন মানুষকে সম্পূর্ণ ভালো অথবা সম্পূর্ণ খারাপ—এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের মধ্যে যেমন শক্তি থাকে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও থাকে। তাই শিশির মনিরের ক্ষেত্রেও তাঁর মেধা, পেশাগত দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক দিকগুলোকে স্বীকার করার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তোলা উচিত।
শেষ কথা: পছন্দের জায়গাটি পরিষ্কার থাকা দরকার
সবশেষে আমার অবস্থান খুব সহজ—আমি ব্যক্তি অ্যাডভোকেট শিশির মনিরকে পছন্দ করি, রাজনৈতিক হিসেবে নয়। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে আমার যথেষ্ট প্রশ্ন ও দ্বিমত রয়েছে; বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তরের রাজনৈতিক দায়-দায়িত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে আমি তথ্য, ইতিহাস ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। কিন্তু একই সঙ্গে একজন মেধাবী, পরিশ্রমী ও দক্ষ আইনজীবীর পেশাগত যোগ্যতা স্বীকার করতেও আমি দ্বিধা করি না। আমার কাছে শিশির মনিরের ব্যক্তিগত মেধা ও পেশাগত দক্ষতার প্রশংসা তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থন নয়। বরং এটি ভিন্নমতকে সম্মান করার, ভালো গুণকে স্বীকার করার এবং ব্যক্তিকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন মানুষ ও পেশাজীবী হিসেবেও মূল্যায়ন করার একটি সচেতন অবস্থান। একজন মানুষের সঙ্গে মতের মিল না থাকলেও তাঁর যোগ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা যায়—আর সেই জায়গা থেকেই আমি বলি, রাজনৈতিক শিশির মনিরের সঙ্গে আমার দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের মেধা ও ব্যক্তিত্ব আমাকে আকৃষ্ট করে।
লেখকঃ আবুল হায়দার মোঃ তরিক, অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, মৌলভীবাজার। হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৫১৬৭৪২৫৮৮
